Saturday, October 1, 2016

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বদলাবে বাংলাদেশের ভাগ্য: ড. হারুন-অর-রশিদ

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট, তিন বার নির্বাচিত ডিন, শিক্ষক সমিতি, এশিয়াটিক সোসাইটিসহ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার নানা গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেন। ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ১১ দিন অজ্ঞাত স্থানে রিমান্ড শেষে পাঁচ মাস কারাভোগও করেন।

৩৬ বছর ধরে শিক্ষকতায় থাকা ড. হারুন-অর-রশিদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লন্ডন থেকে পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক্টরাল করেন। স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, ওয়ান ইলেভেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি আটটি বই লিখেছেন। এছাড়াও সম্পাদিত গবেষণা কর্ম ৫টি, ভাষা-আন্দোলন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদিত গ্রন্থ ৫টি, দেশ ও বিদেশের পত্রিকায় অর্ধশতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার এক ‘বৈপ্লববিক’ পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। কমছে সেশনজট সমস্যা। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রিয়.কম-এর সাথে একান্ত কথা বলেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ।

মুক্ত হওয়ার পথে সেশনজট
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২১ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ২ হাজার ২শ’ কলেজ অধিভূক্ত রয়েছে। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ লাভের পর দেখলাম, এটা একটা মহা সমুদ্রের মতো। এর কোনো কূল-কিনারা নেই। দেখলাম, এত বড় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গাজীপুর ক্যাম্পাস থেকে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি অনুসরণ করে এটা চালানো হচ্ছে।

গাজীপুর ক্যাম্পাস থেকে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে উত্তরপত্র এবং অন্যান্য একাডেমিক সামগ্রী আদান-প্রদান হচ্ছে। ফলে দুর্বিষহ সেশনজটে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। আমি প্রথমেই সেশনজটকে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করলাম।

এই সমস্যা দূর করতে কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রীভূত প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছয়টা রিজওন্যাল (আঞ্চলিক) সেন্টার (সিলেট, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা) আছে; এগুলো বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিভাগীয় শহরে। সেই রিজওন্যাল সেন্টারগুলো আমরা চালু করলাম। সেখানে জনশক্তি দিলাম। কতগুলো লজিস্টিক দিলাম, যেমন কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ যেগুলো আছে। প্রত্যেকটা রিজওন্যাল সেন্টারে একজন পরিচালক রয়েছে, যারা প্রত্যেকে একজন প্রফেসরের পদমর্যদার। এভাবে এটাকে সাজালাম।

এখন আমাদের অনেক কাজ কিন্তু রিজওন্যাল সেন্টারের মাধ্যমে হয়। কোনো শিক্ষক বা পরীক্ষককে আর গাজীপুর আসতে হয় না। তারা স্ব-স্ব রিজওন্যাল সেন্টারে যোগাযোগ করে সেখান থেকেই একাডেমিক ম্যাটেরিয়াল অর্থাৎ পরীক্ষা সংক্রান্ত সবকিছু পেয়ে যায়। ওখান থেকে তারা সব কিছু গ্রহণ করে। এগুলো এক বা দুদিনের ম্যধ্যে ডিসট্রিবিউট হয়ে যায়।
র পর আরেকটা পদক্ষেপ হলো- নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষা এবং তাদের সেশনজট। এই নতুন শিক্ষার্থীরা যেন সেশনজটে না পড়ে সেটা নিশ্চিতে আরও একটি একটি পদক্ষেপ হাতে নিলাম। আমাদের সিদ্ধান্তনুযায়ী তিন মাসের মধ্যেই রেজাল্ট (ফলাফল) দিতে হবে। পরীক্ষা হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই রেজাল্টের ব্যবস্থা করলাম।

সাফল্যের অন্তরালে ক্রাশ প্রেগাম

আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি ২০১৩ সালে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের জন্য কোনো সেশনজট থাকবে না। কিন্তু আমার যোগদানের আগে যারা এখানকার শিক্ষার্থী, যারা সেকেন্ড ইয়ারে, থার্ড, ইয়ারে কিংবা ফোর্থ ইয়ারে পড়ে তাদের তো অনেক সেশনজট রয়েছে। এটাকে কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করি। যাকে আমরা ক্রাশ প্রোগ্রাম বলছি। সেশনজট দূরীকরণে ক্রাশ প্রোগ্রাম একটা একাডেমিক প্রোগ্রাম। এর মাধ্যেমে সেশনজটকে ক্রাশ করতে হবে। এভাবে আমাকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।

এই ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণের জন্য আমাকে গবেষণা করতে হয়েছে। মিনিমাম আট থেকে নয় মাস গবেষণা করেছি। কতগুলো পরীক্ষা এখানে এসে জট বাঁধছে, রেলওয়ে জংশনের মতো। এগুলোর যেমন আলাদা লাইন আছে তেমনই পরীক্ষাগুলো আলাদা আলাদা। সেগুলো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এই ক্রাশ প্রোগ্রামের কারণে পরীক্ষা রেগুলার হচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা-শিক্ষকরা জানেন কোনটা কীভাবে হবে। আমরা ২০১৫ সালে ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছি। গত বছর চলে গেছে। চলতি বছর যাচ্ছে। আমরা ঘোষণা করেছি, ২০১৮ সালের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় করব। নতুন যারা ভর্তি হবে তাদের কোনো সেশনজট থাকবে না। সেভাবে আমরা ক্রাশ প্রোগ্রামকে সামনে রেখে সামনে অগ্রসর হচ্ছি।